হিজামা কি? কেন করাবেন?
হিজামা কি?
হিজামা আর্থ্রাইটিস রোগ, পিঠের নিচের ব্যথা এবং অন্যান্য সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতে পারে। এটি মাথার ব্যথা, মাইগ্রেন, দাঁতের মাড়ির ব্যথা, সমস্ত পেশী ব্যথা, সায়াটিকার ব্যথা এবং অন্যান্য ধরণের ব্যথারও চিকিৎসা করতে পারে। কাপিং ট্রিটমেন্ট একটি উত্তেজক স্থান থেকে মস্তিষ্কে এবং মস্তিষ্কের পিছনের দিকে ব্যথার তীব্রতা কমাতে পারে।
হিজামা বলতে কি বুঝায়?
হিজামা বা হজ্জাম অথবা কাপিং নামে পরিচিত| এই উপমহাদেশের ভারতে বসবাসকারী জাতি গোষ্ঠী কাপিং থেরাপি অনুশীলনের জন্য পরিচিত। হিজামা শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ আল হাজম থেকে। মধ্যপ্রাচ্য তথা আরব দেশগুলিতে একজন কাপিং থেরাপি অনুশীলনকারীকে হিজামা বলা হত এবং ভারতেও এই নামটি ব্যবহৃত হত। মুহাম্মদের কিছু সহকারী খিলাফত ক্ষমতার সময় পারস্য, মিশরে ইসলামের বাণী প্রচার করে। সে সময় তারা হিজামা করাতে শুরু করে।
হিজামা থেরাপি কেন দেওয়া হয়?
হিজামা আরবি শব্দ ( حجامة) যার আবিধানিক অর্থ:"শোষণ করা। হিজমা হল শিঙ্গা লাগানো নামক প্রচলিত চিকিৎসার আরবি নামকরণ। মাথাব্যথা শরীর ব্যথার মত অসুস্থতা দূরকরনে এই চিকিৎসা প্রয়োগ করা হয়। হাদিস গ্রন্থে এই চিকিৎসা পদ্ধতি কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শুষ্ক ও ভেজা কাপিং এর মধ্যে পার্থক্য কি?
o "শুষ্ক কাপিং- এটি করার সময় স্তন্যপান কয়েক মিনিটের জন্য ত্বকে প্রয়োগ করা হয়| কখনও এটি ম্যাসেজ, আবার আকুপাংচার বা অন্যান্য বিকল্প থেরাপির সাথে মিলিয়ে প্রয়োগ করা হয়।
o "ভেজা কাপিং" একই রকম পদ্ধতিতে করা হয়, সামান্য কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ভেজা কাপিং করার জন্য ছোট কাটা দিয়ে রক্ত সরানো হয়।
হিজামা (Cupping) কি?
হিজামা শব্দটি আরবি হাজামা বা হাজ্জামা থেকে এসেছে। যার অর্থ হচ্ছে কমিয়ে ফেলা, পূর্বের আকারে ফিরিয়ে নেয়া, বা আকারে ছোট করে ফেলা ইত্যাদি।
আরবিতে তারা বলে যে, এক লোক সমস্যাটা ছোট করে ফেলেছে- এর অর্থ হচ্ছে “সে সমস্যাটা আগে অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।”
আরও একটা শব্দ আছে “আহজামা” যার মানে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে আসা বা অস্ত্র সংবরণ করা।
তার মানে, যে হিজামা করে, রোগীকে রোগ আক্রান্ত করা বিরত করা হয়।
আপনাদের, আমাদের, সবার শরীরে প্রতিনিয়ত মেটাবলিক বাই-প্রোডাক্ট তৈরি হচ্ছে। রোগ-জীবাণুর আক্রমনের কারনে বিভিন্ন রক্তকনিকা ও টিস্যুর ক্ষতি হচ্ছে। মানুষের বয়স যত বাড়তে থাকে ঠিক তত মানুষের শরীরের বিভিন্ন স্থানে মাসল ও টিস্যুর মধ্যে এই মেটাবলিক বাই প্রোডাক্ট ট্র্যাপ হচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমরা যদি জোরে হাটতে বা দৌড়াতে থাকি তবে কিছুক্ষনের মধ্যেই আমাদের পায়ে ব্যাথা শুরু হয়ে যায়। কারন মেটাবলিক বাইপ্রোডাক্ট আমাদের মাসলে জমা হয়ে নার্ভ এন্ডিং গুলোর পেইন রিসেপ্টরে স্টিমুলেশান দেয়। আবার কিছুক্ষণ রেস্ট নিলে এই পেইন কমে যায়, কারন বাই প্রোডাক্টগুলোকে ব্লাড ফ্লো করে ডাইলিউট করে দেয় এবং কিডনি বা লিভার বা ঘাম গ্রন্থি তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগুলোকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে তলে অথবা সেটা সম্ভব না হলে শরীর থেকে বের করে দেয়।
আমাদের শরীরে ছোট ছোট রক্তনালী (ক্যাপিলারি ও ভেনিউলস) ও নার্ভ (নিউরন) জালিকার মত ছড়িয়ে রয়েছে। বিভিন্ন জীবাণুর আক্রমনে আমাদের রক্তকণিকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ক্ষতিগ্রস্থ রক্তকণিকা অনেক ক্ষেত্রেই ছোট ছোট রক্তনালীতে ট্র্যাপ হয়ে পড়ে এবং রক্ত প্রবাহে বাঁধার সৃষ্টি করে।
হিজামার পদ্ধতি
হিজামাতে শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অংশ থেকে মেশিনের সাহায্যে রক্ত বের করে নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, হিজামায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা ভাল এবং প্রত্যেকের চিকিৎসায় ভিন্ন ভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করা উচিত। যেন, রক্ত জীবাণুর মাধ্যমে দেহে রোগ সংক্রমিত হতে না পারে।
হিজামার ব্যাপারে বর্ণিত কতিপয় হাদীছ শরীফ
(১) হযরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “কেউ হিজামা করতে চাইলে সে যেন আরবী মাসের ১৭, ১৯ কিংবা ২১ তম দিনকে নির্বাচিত করে। রক্তচাপের কারণে যেন তোমাদের কারো মৃত্যু না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে (হিজামা)।” সুনানে ইবনে মাজা, হাদীছ নম্বর : ৩৪৮৬
(২) হযরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “আমি মেরাজের রাতে যাদের মাঝখান দিয়ে গিয়েছি, তাদের সবাই আমাকে বলেছে, হে মুহাম্মদ, আপনি আপনার উম্মতকে হিজামার আদেশ করবেন।” সুনানে তিরমিযী হাদীছ নম্বর : ২০৫৩
(৩) হযরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “গরম বৃদ্ধি পেলে হিজামার সাহায্য নাও। কারণ, কারো রক্তচাপ বৃদ্ধি পেলে তার মৃত্যু হতে পারে।” আল-হাকিম, হাদীছ নম্বর : ৭৪৮২
(৪) হযরত জাবির (রা:) থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “নিশ্চয় হিজামায় শেফা রয়েছে।” ছহীহ মুসলিম, হাদীছ নম্বর : ২২০৫
(৫) হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “খালি পেটে হিজামাই সর্বোত্তম। এতে শেফা ও বরকত রয়েছে এবং এর মাধ্যমে বোধ ও স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পায়।” সুনানে ইবনে মাজা, হাদীছ নম্বর : ৩৪৮৭
(৬) হযরত আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “হিজামাকারী কতই উত্তম লোক। সে দূষিত রক্ত বের করে মেরুদন্ড শক্ত করে ও দৃষ্টিশক্তি প্রখর করে।” সুনানে তিরমিযী, হাদীছ নম্বর : ২০৫৩
(৭) হযরত আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “জিবরীল আমাকে জানিয়েছেন যে, মানুষ চিকিৎসার জন্য যতসব উপায় অবলম্বন করে, তম্মধ্যে হিজামাই হল সর্বোত্তম।” আল-হাকিম, হাদীছ নম্বর : ৭৪৭০
হিজামা কখন করাতে হয়।
এক. স্বাভাবিক অবস্থায় যেভাবে করবে। যথা :
ক. আরবী মাসের ১৭, ১৯ ও ২১ তারিখের কোন একটি নির্বাচন করবে।
খ. সোম, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবারের কোনটিকে নির্বাচন করবে। উল্লেখ্য, তারিখ ও দিনের মধ্যে বিরোধ হলে তারিখকে অগ্রাধিকার দিবে।
গ. খালি পেটেই হিজামা করবে। সকালে খালি পেটে হিজামা করা উত্তম।
ঘ. ফজরের পর হতে দুপুর ১২টার মধ্যে করবে।
ঙ. হিজামার আগের ও পরের দিন সঙ্গম না করা উত্তম।
দুই. জরুরী অবস্থায় যেভাবে করবে।
এপর্যায়ে এটি করতে মাস ও দিনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যখনই সমস্যা হবে ঠিক তখনই করা যেতে পারে। এক দিন রসূলুল্লাহ (সা:) ঘোড়া থেকে পড়ে যান। পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পান এবং এতে করে পায়ে রক্ত জমা হয়। এই সমস্যা থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য তিনি হিজামা করেছিলেন।
হিজামা কোন কোন স্থানসমূহে করানো সুন্নাহঃ
১. মাথার উপরিভাগ তথা মধ্যভাগ
২. মাথার ঠিক মাঝ বরাবর।
৩. উভয় কাঁধে ।
৪. ঘাড়ের নীচে উভয় কাঁধের মাঝখানে।
৫. উভয় পায়ের উপরিভাগে।
৬. মাথার নীচে চুলের ঝুটির স্থলে।
ইহরাম ও রোযায় হিজামা
মুহরিম ও রোযাদারের জন্য হিজামা বৈধ। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত : '' তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা:) মুহরিম ও রোযাদার অবস্থায় হিজামা করেছেন।” সুনানে তিরমিযী হাদীছ নম্বর : ৭৭৫
হিজামা (Cupping) এর মাধ্যমে যে সব রোগের চিকিৎসা করা হয়ে থাকেঃ
১। মাইগ্রেন জনিত দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা (Chronic migraine headaches)
২। রক্ত দূষণ (Blood contamination)
৩। উচ্চরক্তচাপ (High Blood Presser)
৪। ঘুমের ব্যাঘাত (Insomnia)
৫। স্মৃতিভ্রষ্টতা (Perkinsosis disease)
৬। অস্থি সন্ধির ব্যাথা/ গেটে বাত (Arthritis at the gate)
৭। ব্যাক পেইন (Back Pain)
৮। হাঁটু ব্যাথা (Knee Pain)
৯। দীর্ঘমেয়াদী সাধারন মাথা ব্যাথা (Chronic headache)
১০। ঘাড়ে ব্যাথা (Neck Pain)
১১। কোমর ব্যাথা (Low Back Pain)
১২। পায়ে ব্যাথা (Leg Pain)
১৩। মাংসপেশীর ব্যাথা (muscle strain)
১৪। দীর্ঘমেয়াদী পেট ব্যথা (Chronic stomach pain)
১৫। হাড়ের স্থানচ্যুতি জনিত ব্যাথা (Bone displacement pain)
১৬। থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা (Thyroid gland problems)
১৭। সাইনুসাইটিস (Sinusitis)
১৮। হাঁপানি (Asthma)
১৯। হৃদরোগ (Cardiac Disease)
২০। রক্তসংবহন তন্ত্রের সংক্রমন (Infections of the circulatory system)
২১। টনসিলাইটিস (Tonsillitis)
২২। দাঁত/মুখের/জিহ্বার সংক্রমন (Tooth/mouth/tongue infection)
২৩। গ্যাস্ট্রিক ব্যাথা (Gastric pain)
২৪। মুটিয়ে যাওয়া (Obesity)
২৫। দীর্ঘমেয়াদী চর্মরোগ (Chronic Skin Diseases)
২৬। ত্বকের নিম্নস্থিত বর্জ্য নিষ্কাশন (Drainage of wastes under the skin)
২৭। ফোঁড়া-পাঁচড়া সহ আরো অনেক রোগ।
২৮। ডায়াবেটিস (Diabetes)
২৯। অন্ত্রবৃদ্ধি রোগ ; হার্নিয়া ; একশিরা (Vertebral disc Prolapse/ Herniation)
৩০। চুল পড়া (Hair fall)
৩১। মানসিক সমস্যা (Psychological disorder)...
এবং আরও অনেক রোগ।


old medical treatment.
ReplyDelete